সিলেট ২০২৩ ট্যুরের ইতিকতা
ওয়ার্ডক্যাম্পটা আসলে একটা উসিলা মাত্র। প্রায় সবাই এই ক্যাম্পের উসিলায় সিলেট ট্যুর দিয়েছে, কেউবা তাদের বাৎসরিক অফিশিয়াল ট্যুরও এটা দিয়ে কভার করে ফেলেছেন। আমিও হয়তো এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। তারপরেও ভাবলাম নিজের জন্য হলেও একটু লিখে রাখি আমার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল।
একটা সুযোগ খুঁজতেসিলাম সিলেট ট্যুর দেয়ার জন্য। ওয়ার্ডক্যাম্পের ঘোষণা পাবার পর সেটা পেয়ে গেলাম। কিন্তু টিকেট বেচারা আমার সাথে লুকোচুরি শুরু করলো। নিজে ব্যস্ত থাকলে যেন টিকিট পেতে পারি তার জন্য বললাম আমার ফ্রেন্ড সাদ বিন আলম, তুরাগকে। কিন্তু দুইবার চেষ্টা করেও টিকিট পাওয়া গেল না। একপ্রকার আশা ছেড়েই দিসিলাম। কয়েকজন ভাইকে বলেও টিকিট অগ্রীম রাখাইতে পারি নাই। যেটা অবশ্য তাদের দোষ না কোনভাবেই। আমি চাচ্ছিলাম না অন্য কারো নামে আমার টিকিট হউক। একবার ত ভাবলাম স্পন্সর করে ফেলি তাইলে টিকিট পেয়ে যাবো, পরে ভাবলাম ছোট মানুষ এত বড় স্পন্সর করলে লাভটা কি? তবে যখন মাইক্রোস্পন্সরের ঘোষণা পেলাম, তখন আর কিছু না ভেবে দুইটা টিকিট নিয়ে নিলাম, যদি স্পন্সরের কোন অতিরিক্ত সুবিধা ছিল না ওই টিকিটে, জাস্ট এপ্রিসিয়েশন টিকিট আরকি।
কিন্তু এদিকে আমার ছেলেও অসুস্থ হয়ে গেল, আমার কাজের চাপ, তার অসুস্থতা, আর ডেভকনফের জন্য ক্র্যাশ কোর্সের কনটেন্ট, সব একসাথে লেগে গেল। আগে থেকে অনেক প্রস্তুত থাকলেও শেষ মূহূর্তে হিবিজিবি লেগে গেল কোর্সের জন্য ভালো করে বানাতেও পারতেসিলাম না, এদিকে অসুস্থ, ওদিকে সিলেট যেতে হবে নাইলে টিকিট সহ সব লস। আবার সিলেটে ঝড় বৃষ্টি হবার একটা চান্স থাকার কথা ছিল সব রকম রিপোর্টে। কি একটা অবস্থা। যাব কি যাব না।
যাই হউক, সারারাত অনেকটা না ঘুমিয়ে সকাল সকাল বের হয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। এটা আমার বউ বাচ্চার সাথে আমার প্রথম সিলেট ট্যুর ছিল তাই হয়তো একটু অন্যরকম লাগতেসিলো। তিনটা কফি অর্ডার করলাম, বিল আসলো ৭৫০ টাকা। যদিও ওখানের স্টারবাকসের কফি একটাই ৭০০ টাকা লেখা ছিল। বউ ত ৭৫০ টাকার কথা শুনে ফিট। তবে কফি বেশ ভালো ছিল, তাই অভিযোগ করাও যাচ্ছিলো না।
এরপর দেখি শখের ইউএসবাংলা ফ্লাইট ডিলে করেছে। কিন্তু এক্সাইটমেন্টের কারণে সেটা প্রেশার মনে হয়নি, আর ডমেস্টিকে অনেক ভীড় থাকলেও উপরের ফ্লোরে খুব সুন্দর একটা জায়গা ছিল, রিলাক্স করার মত একটা পরিবেশে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে নিলাম। এরপর ফ্লাইটে অনবোর্ড হয়ে নিলাম।
কিন্তু একটু পর শুরু করলো পিচ্চির ক্যা ক্যা। কারণ ফ্যানের সাউন্ডে এমনিতেই একটা মাথা ধরে যাওয়ার মত ব্যাপার হয়, আর ছোট বাচ্চার অবস্থা ত আরো অন্যরকম। যাই হউক, একটু ডিসটার্ব করে এটা ওটা করে শেষমেষ ঘুমানো সম্ভব হলো, আর তার একটু পর সিলেট পৌছে গেলাম।
নামার পর শুরু করলাম হোটেল খোঁজা, আগে ইচ্ছা করেই খুঁজিনাই, কারণ কই না কই গিয়ে উঠবো, পরে পছন্দ না হলে কি করবো? তো বের হতেই ভিক্ষুক আর সিএনজি এসে ধরলো, কোনদিকে যাব না যাব, একটু যুদ্ধ করে মাজারের কাছে একটা হোটেলে গেলাম। কিন্তু গিয়ে মনে হলো অনলাইন বুক করিনি ভাল করেছিলাম, পরিবেশ পছন্দ হয়নি। তার একটু পর আল-আমিন ভাইয়ের পোস্ট দেখে একটু এদিক ওদিক করে চলে গেলাম উনাদের হোটেলে। গিয়ে বিভিন্ন রেফারেন্স দিয়ে দুইটা রুম বুক করলাম। আমার জন্য একটা তুরাগের জন্য একটা। সব পারফেক্ট না হলেও লাইটিং, বেডিং আর ভিউটা দামের তুলনায় মাশাআল্লাহ ভালো ছিল ওখান থেকে। এরপর একটু রেস্ট নেয়ার পালা। ওহ, বিকাল আর রাতের খাবারের জন্য আমরা ওখানেই একটা হোটেল থেকে মজাদার কিছু খাবার খেয়েছিলাম। হোটেলের নামটা মনে নাই যদিও, আরেহ!
রেস্ট নিয়ে বের হয়ে কই যাবো না বুঝতে পেরে আবার হোটেলে ব্যাক করলাম। এরপর সন্ধ্যায় চলে গেলাম সাস্টে। ওখানে ওয়ার্ডক্যাম্পের ভ্যানু ছিল। গিয়ে দেখা হলো থ্রাইভডেস্ক টিমের কয়েকজনের সাথে। টিমের নাইম ভাই সাজেশন দিলেন মনিপুরী মার্কেটের কথা। তাই বের হয়ে চললাম ওইদিকে। এরপর কিছু হালকা কেনাকাটা করে হোটেলে ফেরত এলাম। ততক্ষণে সারাদিনের জার্নিতে প্রচন্ড টায়ার্ড।
সকালে উঠে ভেন্যুতে পৌছাতেই দেরী হয়ে গেল। সাথে ওয়াইফকে নিয়ে গেছিলাম, সে বাইরে একপাশে দাড়ালো, আমি পিচ্চিকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। বিশাল এক কাবজাব লেগে আছে, সবাই ব্যস্ত বিভিন্ন রকম গিফটের লাইনে বিভিন্ন বুথের সামনে, কুইজ, ছবি তোলা সহ কত কিছু! এত কিছুর ভিতর পিচ্চিকে নিয়ে পারা না গেলেও এদিক ওদিক একটু ঘুরলাম, অডিটোরিয়ামেও একটু ঘুরলাম। আর এদিক ওদিক পিচ্চিকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলাম। ছোট মানুষ আবার নজর যেন না লাগে সেদিকও খেয়াল রাখতে হবে তাইনা 😕? আচ্ছা যাক, একটু পর পরিস্থিতি একটু হালকা হবার পর, বের হয়ে বউকে নিয়ে ঢুকলাম, এতক্ষণ বাইরে দাড়িয়ে থাকলে আসলে লাভ নাই, পুরাই লস। বউকে নিয়ে এদিক ওদিক দেখালাম, বিভিন্ন বুথে কুইজের জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছিলো, কিন্তু আমার ইচ্ছা হচ্ছিলো না।
দেখা করলাম আমার বড় ভাই আদনান ভাইয়ের সাথে। ভাই আমাকে সেই ছোট বেলা থেকে অনেকভাবে হেল্প করেছিলেন। বিশেষ করে ২০১১ সালের ওয়ার্ডপ্রেসের শুরুর জার্নির একটা অংশে বিশেষভাবে উনি আছেন। উনার সাথে কথা বলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিলো। ইনশাআল্লাহ নেক্সট টাইম আরো সময় দিয়ে কথা হবে।
এদিকে হাসিন ভাই আসার কথা। উনাকে দেখতে পেয়েই দেখা করতে গেলাম, হালকা কথা বললাম, চারপাশে ফ্যান ফলোয়ারের মাঝেও টুপ করে ছবি তুলে নিলাম, এরপর ফেরত আসলাম। কিন্তু ততক্ষণে বউ ত ফায়ার, এই হাসিন ভাই আসতেসে দেখে এভাবে ফেলে যেতে পারেন না! সারাক্ষণ হাসিন ভাই অমুক, হাসিন ভাই তমুক, আরেহ!
এরপর আরেকটু ঘুরে একটু একটু গিফট কালেক্ট করে, দুপুরের নামাজের পর খাবারের জন্য একটু দৌড়ালাম। সত্যি বলতে পুরো ইভেন্টে এটা একটু গোলমাল লেগেছিলো। মিছা কথা বলতে পারব না। লম্বা লাইন, আর প্রচন্ড গরমে বুফের ব্যাপারটা আসলে মিলে নাই। আমি আসলে খাইতে পারি নাই, হালকা একটু খেয়ে চলে আসছিলাম। নেক্সট টাইমে আশা করি এমন ব্যাপারগুলো এভয়েড করা হবে।
বউকে নিয়ে হোটেলে রেখে আবার ফেরত এলাম। এসে দেখি হাসিন ভাইয়ের অসাধারণ সেশন, কানায় কানায় পরিপূর্ণ। অসাধারণ একটা সেশনের পর বের হয়ে এলাম। আর শেষ মূহূর্তে এহসান ভাইয়ের একটা প্যানেল সেশনেও বেশ অনেক কিছু শিখতে পেরেছিলাম, তবে আরো ভালো করে সেশনগুলো শোনা উচিৎ ছিল।
টাইমগুলো ঠিক মনে নাই, তবে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে এহসান রিয়াদ ভাই, ফয়সাল জাফরি ভাই, নাসির বিন আমান ভাই, নুরুল আমিন ভাই, কুড়েঘরের জাহিদ ভাইকে পেলাম। এছাড়া সবচেয়ে অসাধারণ একটা হসপিটালিটির জন্য শেইপডপ্লাগিনস এর ভাইদের কথা কোন ভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
এবারের কনফারেন্সে সবাই বেশি বেশি আইটেম পেলেও আমি বেশি করে কিছু করতে পারিনাই। কারণ ধাক্কাধাক্কি আমার কোনভাবেই ভালোলাগেনা। এত কিছুর পরেও মেবি পাঁচটা টিশার্ট পাইসিলাম, চেক করে দেখতে হবে। তবে শেষ মূহূর্তে একটা নেপালের টিকিটের জন্য একটু ট্রাই মারতে গিয়ে শুনি টাইম শ্যাষ। তবে ওখানে অনেক ভাইদের সাথে একটা সেলফি তুলে ওখানের যুদ্ধ শেষ করি। এরপর বাইরে গিয়ে বসি, ফয়সাল আহমেদ ভাই সহ বেশ কয়েকজন ভাইয়ের সাথে একটু আলোচনা হয়। এদিকে রাফসান ভাই এসে বেশ কিছু সুন্দর ছবি তুলে দিলেন।
শেষ পর্যন্ত থাকতে পারলে হয়তো অন্যরকম হতো, কিন্তু আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী, পরিশেষে অসাধারণ একটা দিন পার করে, একটু দৌড় দিয়ে নাইম ভাইয়ের বাইক নিয়ে তুরাগ আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিল। তারপর একটু চা বাগানে ঘুরে এসে রাতে কয়েকটা ওয়াকওয়ে, ব্রিজ সহ বেশ কয়েকটা জায়গায় ঘুরে আসার প্ল্যান করলাম। এরপর মনিপুরী মার্কেটে আবার গিয়ে ওখানেও থ্রাইভডেস্ক টিমকে দেখতে পেয়েছিলাম। কিভাবে কিভাবে তাদের সাথে সময়টা মিলে যাচ্ছিলো। মেবি মনের জিপিএসই বড় জিপিএস হয়ে যাচ্ছিলো। এরপর একটু পাঁচভাইতে গিয়ে ফেরত এসে পরদিনের প্লান করে ঘুমিয়ে গেলাম।
শেষ দিন সকাল সকাল উঠলাম, কারণ শেষ দিন, একটু না ঘুরলে হয়? সকালে অসাধারণ একটা আবহাওয়া দেখে চরম উত্তেজিত হয়ে নেমে পড়লাম, কখন যাবো কখন ঘুরবো? ওদিকে তুরাগ ত উঠেনা, কেউই উঠেনা, তারপরেও একটু গুতিয়ে গুতিয়ে বের হলাম। বের হবার আগে হোটেল চেক আউট করে নিলাম, প্ল্যান ছিল একটু ঘুরে হোটেলের জিনিসগুলো নিয়ে ফ্লাইট ধরবো। কিন্তু এবার সবাই বের হতেই ঝড় শুরু হলো। প্রচন্ড বৃষ্টি। তাইলে এবার?
ঝড়ের মাঝেই নাস্তার খোঁজে বের হতে গিয়ে সাদাপাথরের দিকে রওয়ানা দিলাম। একটু পর ঝড় থেমে যাবার পর রাস্তায় একটা হোটেলে দাড়ালাম। যেখানে একটু পর কয়জন হিজড়া এসে বসলো। হিজড়া নিয়ে আমার ইতিহাস কখনোই ভালো ছিল না। তাই একটু আনইজি হয়ে গিয়েছিলাম। তবে আলহামদুলিল্লাহ কোন সমস্যা হয়নি।
এরপর সাদাপাথর পৌছে গেলাম। ইনজয় করতে করতে বেশ কজন ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। একটু কষ্ট করে হেটে একটু ইনজয় করতে লাগলাম। মেবি পুরা জার্নিতে এটাই একটা প্রশান্তির সময় ছিল। যাই হইলো ফেরত আসা শুরু করলাম। ফেরত আসার সময় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তারপরেও সমস্যা অতটা হলো না। কিন্তু ফেরত আসার সময় আবার দেখা হয়ে গেল থ্রাইভডেস্ক টিমের সাথে। আরেহ!
যাই হউক, সবাইকে বিদায় জানিয়ে রওয়ানা দিলাম রাতারগুলের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে কয়েকজন পিচ্চি আর বড়দের সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়লাম। পিচ্চিরা ওয়াশরুমকে নিয়ে একটা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে আর নৌকার ঘাটে বাকিরা সিন্ডিকেট করে রাখসে। তার উপর ছিল নামাজের ব্যাপার। তারপর সব মিলিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাতারগুলটাও ভ্রমন দিয়ে ফেললাম। যদিও শুরুর জার্নিটা মজা ছিল, শেষের দিকে একটু বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
এরপর ফেরত এলাম হোটেলে, আবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হোটেল বুক করলাম, করে চলে গেলাম পাঁচ ভাইতে। যাওয়ার পর আবু হুরায়রা বিন আমান ভাই আর তার দলবল, সাথে হারুন আর রায়হান ভাই সহ অনেক ভাই আসা শুরু হলো। ততক্ষণে আমার খানাপিনা শেষ। যাক, বিদায় নিয়ে ফেরত এলাম। ফ্রেশ হয়ে রাতে শামস ভাইয়ের টিমের সাথে বিদায়পর্ব সেড়ে, আরেকটু রেডি হয়ে এয়ারপোর্ট এলাম।
এসে শুনলাম আবারো ফ্লাইট ডিলে হয়ে গিয়েছে। ধৈর্য নাই আর। কবে ফেরত যাবো? এটা কোন কথা? যাক, অনেক টায়ার্ডনেস নিয়ে ঢাকায় ফেরত এসে ট্যুর শেষ করলাম।
মহান আল্লাহর দয়ায় এই জার্নি থেকে অনেক কিছু শিখতে ও জানতে পেরেছি। নেক্সট টাইম এই জ্ঞানগুলো কাজে লাগাতে পারব। টাকার হিসাব করলে হয়তো এবারের রিটার্ন অনেক কম ছিলো, কিন্তু সেইটা হিসাব করলে ত কিছুই হতো না, আর এত মানুষের সাথে দেখা ও কথা বলাও হতো না।
Member discussion